২০২৩ সালের জানুয়ারি। পরিবারসহ মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি গিয়েছিলাম। শীতের সকাল। হালকা কুয়াশা ছিল। পাহাড়ের সবুজ আর গুহার রহস্য দেখতে আমরা পৌছালাম আরওয়াহ গুহায়। আমি, আমার স্ত্রী আর দুই সন্তান- সবাই মিলে এটা ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা। গুহার ভিতরের ছোট ছোট শঙ্কু আকৃতির ফসিল দেখতে দেখতে এগুচ্ছিলাম। যেন পৃথিবীর ইতিহাসের এককেটা পাতা খুলছিলাম।
চেরাপুঞ্জি বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৩.৫ কিলোমিটার দূরে লাউ শিন্না ফরেস্টে আরওয়াহ গুহা। আমরা সকাল সকাল বেরিয়েছিলাম। জানুয়ারির শীতে পথটা একটু পিচ্ছিল ছিল। এন্ট্রি ফি ছিল মাত্র ৫০ টাকা প্রতি জন। গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। গাইডের সাহায্যে ভালোই হয়েছিল। গুহাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ মিটার। ভিতরে একটা ছোট গিরিখাত বয়ে গেছে। পানি কম ছিল। তবে বর্ষায় পানি বেশি হয়। পানি কম থাকায় সহজ ছিল হেটে বেড়ানো।
আমার পুত্র কন্যা ছাদ থেকে ঝোলে পড়া পাথর (স্ট্যাল্যাকটাইট) আর মেঝে থেকে উঠে আসা চির ধরা পাথর (স্ট্যাল্যাগমাইট) দেখে খুব উত্তেজিত। বাবাইরা বলছিল, “এটা কি জাদুর রাজ্যে, বাবা?” উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেলাম সবাইকে নিয়ে।
গুহার ভিতরে আলোক বাতির সংযোগ আছে। তবুও কিছু কিছু জায়গায় টর্চ লাইট লাগে। আদিম যুগের অবসান গুহা দেখছিলাম। ভাবছিলাম পূর্বতনরা জীবন কাটাতেন এসব গুহায়! ভয়ংকর রকমের জীবন ছিল তাদের।
যতই এগুচ্ছি, গভীর হচ্ছে পরিবেশ। গুমোট গন্ধ যুক্ত হাওয়া। দেয়ালে নানা আকৃতির ফসিল আর গুহাবাসী কীটপতঙ্গ’র ডাক। সব মিলিয়ে খানিকটা সময় নিজেরই গুহা মানুষ হিসেবে খোঁজে পাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম আর লক্ষ্য করলাম, বাচ্চারা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছে। অপলক তাকিয়ে দেখছে। শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি মাছের আকারের ফসিল। একেকটা একেক রকম। আমরা থেমে গেলাম এই ফসিলের সামনে। ছোট ছোট শিং-এর মতো, সর্পিলাকার গঠন। গাইড বুঝতে পেরেছে আমরা কিছু জানতে চাই। নিজ থেকেই বলতে শুরু করলেন- “এগুলো প্রাচীন সমুদ্রেরবাসিদের অবশেষ।” মুহূর্তে মনে হলো, আমরা শুধু গুহা দেখছি না। অতীত পৃথিবীর সাক্ষী হচ্ছি। প্রমাণ দেখছি।
আরওয়াহ গুহার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এই ফসিলগুলো। এগুলো চুনাপাথরে দেয়ালে আটকানো। এরা মূলত সমুদ্রীয় শামুক, কাঁকড়জাতীয় প্রাণীর ফসিল। প্রাচীন টেথিস সাগরের পূর্বাংশের কিছু মাছের হাড়ও দেখা যায় এখানে।
গুহাটির অবস্থান সমুদ্র পৃষ্ট থেকে ৪৫৯৩ ফুট উচ্চতায়। এরা এলো কি করে এখানে? বিজ্ঞান বলছে- ফসিলগুলোর বয়স প্রায় ৫০ থেকে ৫৬ মিলিয়ন বছর। গুহাটি ইওসিন (Eocene) বা ক্রিটেশিয়াস (Cretaceous) যুগে সৃষ্টি হয়। সেই সময় মেঘালয়ের এলাকা টেথিস সাগরের অংশ ছিল। টেথিস (Tethys Sea) একটি প্রাচীন সাগরের নাম। প্রাগৈতিহাসিককালে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলে আজকের মেঘালয় সৃষ্টি হয়। ভারতীয় প্লেট আর ইউরেশিয়ান প্লেট ধাক্কায় পাহাড় হয়েছে। কোটি কোটি বছরপরে বৃষ্টির পানিতে লাইমস্টোন ক্ষয়ে গুহা তৈরি হলে পাথরের গায়ে ফসিলগুলো রয়ে যায়। থেকে যায় সময় চিহ্ন।
গাইড গল্প বলছিলেন। আমরা অবাক হয়ে শুনছিলাম। ৪৫৯৩ ফুট উচ্চতায় সমুদ্র ছিল? সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এটা শুধু ভ্রমণ নয়। একটা অভিযাত্রা। অভিজ্ঞতা।
গুহার ভিতরটায় অনেক ঠান্ডা ছিল। কিন্তু উত্তেজনায় বেশি কিছু টের পাইনি। কিছুই বুঝিনি। আমরা ঘণ্টাখানেক ভিতরে কাটিয়েছি। ফসিল ছুঁয়ে দেখেছি। ছবি তুলেছি। নদীর পানিতে পা ভিজিয়েছি। বাইরে বেরিয়ে লাউ শিন্না ফরেস্টের কাছে একটা ছোট ঝর্ণার ধারে বসেছি। বিশ্রামেও ছিল দূর পাহাড়ের রুপ। দিনটা আমাদের পরিবারের জন্য খুব সুন্দর ছিল।
যদি আপনি যান, তাহলে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস বেছে নিন। পানি কম থাকে। গাইড নিন। টর্চ আর আরামদায়ক জুতো নেবেন। আরওয়াহ গুহা শুধু পর্যটন স্থান নয়। এটা পৃথিবীর অতীতের একটা জানালা। সেই ভ্রমণের স্মৃতি আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।🪨



