shape

বই রাজ্য-সিডনি গণগ্রন্থাগার ও অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন পার্লামেন্ট

সিডনির রৌদ্রজ্জ্বল সকালে গরম চায়ে চুমুক দিতে ভাবছিলাম কোথায় ঘুরতে যাবে।  ক’দিন সঙ্গ দিয়েছেন বন্ধু সহকর্মী শাহাব উদ্দিন শিহাব। আজর তিনি কর্মস্থলে ব্যস্ত। তাই আজ একাই বেরিতে হবে। ক্যান্টারবেরি-ব্যাঙ্কটাউনের লাকাম্বা ট্রেন স্টেশন থেকে ৫৫ মিনিটের পথ সিটি অব সিডনির ম্যাককুয়ারি স্ট্রিট-১ শেক্সপিয়ার পেলেসে রওয়ানা হলাম। ট্রেনে যেতে পথে বানিজ্যক শহর সিডনির গোছানো, সাজানো নগরায়ন দেখছিলাম। ১২ হাজার ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারের পরিকল্পিত বর্ধমান এই শহর ঘুরে বেড়াতে সড়ক যোগাযোগ, ট্রেন যোগাযোগ, নৌ পথ এমনকি আকাশ পথও হাতের নাগালে। ট্রেনের জানালায় বসে দেখেছি কয়েকটি হেলিকপ্টারের উড়া উড়ি। ২৪০ থেকে ২৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে সিডনি শহর উড়ে বেড়ানো যায়। নগরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেনে চড়ে গন্তব্যে পৌছাই। প্লাটফর্মের ডিজিটাল ডিসপ্লেতে চোখ বুলিয়ে ম্যাককুয়ারি স্ট্রিটে বের হই ভূগর্ভস্থ প্লাটফর্ম থেকে।  প্রথমেই স্ট্রিটের চত্ত্বরে দৃষ্টি আটকায় ভিক্টোরিয়ার স্টেচ্যুতে। ফটো সেশন করে এগিয়ে যাই ৪০০ মিটার অদূরে গন্থাগারের প্রবেশ মুখে। দুপাশে সড়ক। মাঝখানে সেক্সপিয়ার যেন আগতদের স্বাগত জানাচ্ছেন। হেনরী গুলেট (Henry Gullett) ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে এটি স্থাপন করেন। ছ’টি সুউচ্ছ খিলানের ছাউনি তলে প্রবেশদ্বারে আগত যেকেউ সম্ভাষন পাবেন স্থাপথ্য ভাষায়। গণ গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলাম। বিশাল পড়ার ঘর। চারিদিকে বই আর বই। শত পাঠক, গবেষক টেবিলে টেবিলে। দ্বিতল কক্ষের দেয়াল ঘেষা সিঁড়ি। উপরের বইগুলোও যেন সহজে পরখ করতে পারেন পাঠকরা। নিস্তবদ্ধ, নিরবতায় পড়ুয়ারা মগ্ন। আমি রেকে রাখা বইগুলো দেখতে ধীরে ধীরে হাটছি। মেজেতে মখমল বিছানো। তবুও যেন পায়ের শব্দ কানে আসছে। হাজারে হাজার বইয়ে হারিয়ে যাচ্ছিলাম।  কোথায় কি আছে দেখতে অর্থ্যাৎ একনজর দেখে নিলাম বই রাজ্য। কোন কোন বই নেই এখানে? বিস্মিত। এতো বড় বইয়ের রাজ্য আমি আগে দেখিনি। আগেই যেনে নিয়েছিলাম, এখানে ফ্লাস লাইট ছাড়া ছবি, ভিডিও তোলা যাবে। তাই দু একটা ছবি তোলে নিই। এবার সেক্সপিয়ার গ্যালারীতে। উলিয়াম সেক্সপিয়ারের আবক্ষ মুর্তি দিয়ে প্রবেশদ্বার সাজানো। ছবি, লেখাজুখা কতো বিরল সব উপস্থাপনা। গ্যালারী ঘুরে দেখতে যেকোন পর্যটকের অনন্ত ঘন্টাখানেক সময়তো লাগবেই। আমি প্রবেশ করেছিলাম সাড়ে বারোটায়। শুধু একপল দেখে দেখে বেরিয়েছি বিকেল সাড়ে চারটায়। শুধুমাত্র পড়ার ঘর আর গ্যালারীতে কেটেছে পুরোটা সময়। দেখেছি শত শত বছরের পুরোনো ইতিহাসের নিদর্শন সমূহ। অস্ট্রেলিয় সংস্কৃতির আদিকাল থেকে আধুনিক। সিডনি ভ্রমনে এসে গ্রন্থাগারে না আসতে পারলে ঠকে যেতাম। পড়ন্ত বিকেলে গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আসি। তখন প্রচন্ড খিদে। সড়কের ওপারে যাই, খাবারের দোকানে। ততক্ষনে পাচঁটা ছুঁই ছুঁই। দোকানিদের বেলা শেষ। ব্যবসা বন্ধের তাড়াহুড়ো চলছে। বইয়ের গন্ধে সারাদিন খাবোরের কথা মনে না পড়লেও এখন যেন তর সইছে না। কয়েকটি দোকানে খোঁজাখুজির পর ভ্রাম্যমান গাড়িতে সিঙ্গেল শট এক্সপ্রেসোতেই মুখ বদলাই। ভিক্টোরিয়া স্টেচ্যুর সামনের বিশাল বৃক্ষ তলে কফি কাপেই সন্ধ্যা নামে। সামনে কতো মানুষের দৌড়ঝাপ। গাড়িতে, ট্রেন স্টেশনে যাবার তাড়া। সবই দেখছি, কিন্তু ঝাপসা। চোখে গ্রন্থাগারের আবেশটা যেন যাচ্ছেই না। হয়তো দেখা নয়; নিয়ম করে প্রতিদিন একবার পড়ার ঘরে আসলেও বইয়ের বিশাল এই রাজ্য জয় সম্ভব নয়। তৃষ্ণা রেখেই ফিরলাম। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে কেউ যদি ভ্রমনে আসেন, আপনার ভ্রমন তালিকায় ‘পাবলিক লাইব্রেরী অব নিউ সাউথ ওয়েলস’ রাখবেন। নিশ্চিত করেই বলছি- ঠকবেন না। জিতেই ফিরবেন।  গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ‘অস্ট্রেলিয়ান সাবস্ক্রিপশন লাইব্রেরী (Australian Subscription Library) ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে পিট স্ট্রিটে (Pitt Street) ভাড়া ভবনে এর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী দুই বছর গ্রন্থাগারটি ভ্রাম্যমান সেবা প্রদান করে। পরে বেশ কয়েক বছর জর্জ স্ট্রিটে, ব্রিজ স্ট্রিট, ম্যাককুয়ারি স্ট্রিট এবং ম্যাককোয়ারি প্লেসে গ্রন্থাগারটি স্থানান্তরিত হয়। শেষমেষ ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বেন্ট এবং ম্যাককুয়ারি স্ট্রিটের (Bent and Macquarie Streets) নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীনতম গ্রন্থাগার ‘নিউ সাউথ ওয়েলস স্টেট লাইব্রেরী’। নানা সমস্যায় গ্রন্থাগারটির অচলাবস্থায় পড়লে ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে নিউ সাউথ ওয়েলস সরকার ‘অস্ট্রেলিয়ান সাবস্ক্রিপশন লাইব্রেরীটি (Australian Subscription Library) কিনে নেয় এবং নামকরণ করা হয় পাবলিক লাইব্রেরী অব নিউ সাউথ ওয়েলস/দি স্টেট লাইব্রেরী অব নিউ সাউথ ওয়েলস (The State Library of New South Wales)। দেশের প্রথম এই গ্রন্থাগারটি দুই হাজার পুস্তক নিয়ে নব যাত্রা শুরু করে। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় গ্রন্থাগারটির উন্নয়ন করা হয়। মিচেল উইং ও ডিক্সন উইং নামের দুটি ভবনে বিস্তৃত হয় এটি। ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রিন্স ফিলিপের ( Prince Philip) সাথে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ (Queen Elizabeth-II) গ্রন্থাগারটির নতুন সংযোজনের উদ্বোধন করেন। স্থপতি মি.  অ্যান্ড্রু অ্যান্ডারসন (Mr Andrew Andersons) এবং ওয়াল্টার লিবার্টি ভার্নন (Walter Liberty Vernon) ছিলেন গ্রন্থাগারটির স্থপিতি। এখানে রয়েছে প্রদর্শনী গ্যালারী, রিডিং রুম, বইয়ের দোকান, শেক্সপিয়ার রুম, লাইব্রেরী ক্যাফে, ফ্রেন্ডস রুম, ও লাইব্রেরী বার। বিভিন্ন গ্যালারীতে ১২ ৭৬ টি পেইন্টিং, মানচিত্র রয়েছে ৩০২টি এবং ২৪ ৭৩৫টি ছবি সংগ্রহে রয়েছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, গবেষনা, বিশ্বযুদ্ধ সহ নানা বিষয়ে বিশাল সংগ্রহ গ্রন্থাগারটিকে সমৃদ্ধ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ও প্রাচীনতম পার্লামেন্ট আপনার হাতে সময় থাকলে একই দিনে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ও প্রাচীনতম পার্লামেন্ট দেখে আসতে পারেন। সকাল ৯ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। গণগ্রন্থাগারের পরেই সিডনি হাসপাতাল, এর পরের ভবনটিই ঐতিহাসিক ‘দি রাম হসপিট্যাল’। আপনি নিজের পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত নিরাপত্তা চৌকি পেরিয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করতে পারেবন। ইনফরমেশন ডেস্কে পার্লামেন্ট সর্ম্পকিত সকল তথ্য পাবেন। আমি পার্লামেন্ট ভবনের বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইছিলাম। ফলে আমাকে একজন কর্মকর্তা পুরো ভবনের কোথায় কি আছে ঘুরে দেখান এবং বিষদ বর্ণনা করেন। তবে, পার্লামেন্টের আভ্যন্তরিক কিছু আইন কানুনের কারণে আমি সব কক্ষে প্রবেশানুমতি পাইনি। ১৯ জুলাই ২০২৩ তারিখে নির্ধারিত কোন সভা না থাকায় ঘুরে দেখাটা সহজ হয়। এখানে ভ্রমনের ক্ষেত্রে কোন ধরণের ফি প্রদান করতে হয় না। পার্লামেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা খুবই আন্তরিক। তারা আপনার এবং আপনার দেশ সর্ম্পকে জানতে চাইতে পারে। নিউ সাউথ ওয়েলসের পার্লামেন্ট। এটি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম এবং প্রাচীন পার্লামেন্ট। প্রতিষ্ঠাকালীন ভবনের কিছু অংশ এখনও সংরক্ষিত আছে। সিডনিতে ১৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। নিউ সাউথ ওয়েলসের তৎসময়ে গভর্নর ছিলেন লাচলান ম্যাককুয়ারি (Governor Lachlan Macquarie)। তখনও এখানে স্থায়ী হাসপাতাল সুবিধা ছিলও না। তিনিই সিডনিতে প্রথম স্থায়ী হাসপাতাল পরিচালনা করেন, এর কার্যক্রম শুরু ১৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে। হাসপাতালটি নির্মাণ করতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ষাট হাজার গ্যালন ‘রাম’ আমদানি ও বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়। এ কারণে হাসপাতালটির নামকরণ করা হয় ‘দ্য রাম হসপিট্যাল’। প্রতিষ্ঠাকালীন মূল ভবনের দুটি অংশ টিকে আছে যা বর্তমানে নিউ সাউথ ওয়েলস-এর পার্লামেন্টের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে শাসকরা গভর্নরকে সহায়তা করতে এ রাজ্যে একটি আইনসভা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিলও নিউ সাউথ ওয়েলস-এর গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার প্রথম ধাপ। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম কাউন্সিলের সভা অনুষ্ঠিত। সে সভায় পাঁচ সরকারী কর্মকর্তা অংশ নেন। ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে আইনসভা বর্ধিত করা হয়। নিউ সাউথ ওয়েলসে গণতন্ত্রের বিকাশ ও পার্লামেন্ট ভবনের কার্যকর ভূমিকা রাখতে করে। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে পূনঃনির্মাণ করে ১২ তলা বিশিষ্ঠ ভবনে রূপান্তর করা হয়। বর্তমান পার্লামেন্টে বিধানসভা, আইন পরিষদে রাজ্যের ৯৩টি জেলার প্রতিনিধি রয়েছেন এবং ২৩ জন মন্ত্রী সরকারের দায়িত্ব পালন করছেন।   আব্দুল আলিম শাহ, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

অপেরা-হারবার; প্রশান্ত পাড়ের প্রশান্তি

ছোট বেলায় ক্যালেন্ডারের পাতা, পোস্টার-স্টিকারে ‘সিডনি অপেরা হাউস’ ও ‘ডার্লিং হারবার ব্রিজ’ এর কত্তো ছবি দেখেছি। সময় আন্তাজ নেই। তবে, ছবিগুলো মনে গেঁথে আছে আজও। ভাবতাম- যদি স্থাপনাগুলোর সামনে কখনও দাঁড়াতে পারতাম। স্বচক্ষে দেখতে পারতাম বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলো। কেমন অনুভূতি হতো? জারপরনাই সুখি হতাম। বড় হতে হতে ভাবনাগুলো স্বপ্নে পরিনত হয়। স্বপ্নগুলোও বড় হতে থাকে। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমনের সুযোগ হয়। ভ্রমনের দ্বিতীয় দিনেই চলে আসি অপেরা হাউজ, হারবার ব্রিজে। সাগরের হীম হাওয়ায় শুনি সেই ছোট বেলার স্বপ্ন কথা। কানে ভাসে সে সময়ের ভাবনাদের শব্দ। আর স্থাপথ্যের ভাষায় দেখি প্রশান্ত পাড়ের স্বপ্নদের। কি অদ্ভুত অনুভূতি, ভালো লাগায় ডুবে যাই। ভাবনার, স্বপ্নের শেষ হয়ে যায় এক মুহুর্তেই। ১৭ জুলাই ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ। গোধূলী লগ্ন। প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলে সূর্য্যাস্তকাল। একটু পরেই আধাঁর নামবে। পশ্চিমাকাশের সোনালী আভায় সাগরের নীল জল রং বদাচ্ছে প্রতিমুহুর্তে। ‘ডার্লিং হারবার ব্রিজ’ কালের কালি মুছে উপস্থাপনায় দৃড় হয়ে উঠছে। এ যেন এক নব নির্মাণ। নিজস্ব রং, বয়স ছাপিয়ে  অন্য রূপ ধারণ করছে স্থাপনাটি। যখন মেঘাকাশের তলে সিডনি আধাঁরের হারাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন হারবার দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ভিন দেশিদের নজর কাড়তে রং ছড়াচ্ছে জল-আকাশের তলে। অদূরে সমুদ্র জলে জলকেলিতে হাতছানি দিয়ে ভ্রমনার্থীদের ডাকছে অপেরা হাউজ। নিজস্ব স্থাপথ্য গৌরবে মুগদ্ধ করছে অপেরার নৌ রূপ। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের প্রধান শহর সিডনি। প্রাচীন এই শহর রাজ্যের রাজধানীও। সিডনির অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র অপেরা হাউজ। এর অবস্থান সিডনি সমুদ্র বন্দরের বেনেলং পয়েন্টে। এই বন্দরের নাম আগে ছিলও ম্যাককুইরি বন্দর। নৌকার পাল আকৃতির অপেরা হাউজটি পর্যটকদের আকর্ষণের শীর্ষে রয়েছে। ইউনেস্কো’র বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দেে এটি যুক্ত হয়। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে অপেরা হাউজের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ড্যানিশ স্থপতি জর্ন উটজনের (Architect Jørn Utzon) হাতেই। নির্মাণ ব্যয়বহুল ও স্থপতি উটজনের নকশা ত্রুটি কারণে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রকল্পের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। পরে পিটার (Peter) নামের এক স্থপতি অপেরা হাউজের ত্রুটি সংশোধন করে নির্মাণ কাজ শেষ করেন। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ২০ অক্টোবর, ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে আধুনিক স্থাপত্যে এ নিদর্শন উদ্বোধন করেন। অপেরা, হারবার ব্রিজের সৌন্দর্য্য উপভোগে স্বপ্নের কাছাকাছি দাঁড়াই। অনুভূতি কেমন ছিলও তখন? বুঝাবার সুযোগ খুবই কম। শুধু চোখে ভাসছিল ছোট বেলার ক্যালেন্ডারে ছবিগুলো। আর নিজের চোখে মিলিয়ে দেখছিলাম অপেরা-হারবারের স্থাপথ্য। গুলমেলে লাগছিল, ছানাবড়া চোখে এদিক ওদিক দেখছিলাম। প্রকৃতি আর আধুনিক স্থাপথ্যের সম্মিলন ম্যাজিকমুমেন্ট শেষ হলে হয়তো বিলিন হবে সেই তাগিদ ছিলও। দ্রুতই কাটে মুগদ্ধতার সময়গুলো। স্থাপনাগুলোর অবস্থান, স্থাপথ্য নকশার অভিনবত্ব আর সাগর প্রকৃতি- সব মিলিয়ে স্বপ্ন যেনো হাতের মোঠোয় ছিলও খানিক সময়। অপেরা আর হারবার ব্রিজের দুপাশের পাহাড়ি বসতিগুলোও সিডনির পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। অপেরার প্রবেশ পথের সমুদ্র ঘাট থেকে ছোট ছোট জলতরিতে সাগর চ্যানেলে ভ্রমনের সুযোগ রয়েছে। দুপাশের পাহাড়গুলোয় গড়ে উঠা বসতির দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন ভ্রমনকারীরা। আমি অবশ্য সে সুযোগ নিতে পারিনি, সময়ের স্বল্পতায়। অপেরা হাউজের পশ্চিম পাশ থেকে হারবার আর পূর্ব থেকে অপেরার প্রেমেই আটকে ছিলাম। সামনের বিশাল খোলা জায়গা ধরে নৌকাকৃতির অপেরার সবদিকে হেটেছি। ভিন্নতর দৃশ্যে নির্মাণ রহস্য, সংস্কৃতির মেলবন্ধন খোঁজেছি। গোধূলী বেলায় আপনিও আসলে এবং রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়া থাকলে আপনিও আপ্লুত হবেন। বানিজ্য শহর সিডনির ঐতিহাসিক স্থাপনা সমূহের পাশের বহুতল ভবনগুলোও যেন এই লগ্নে নিজেদের মেলে ধরছি। গোধূলী আলোর সব রং যেন ধারণ করছিলও ভবনগুলোর গায়ে। দেখে মনে হয় পুরো এলাকায়টাই যেন সূর্য্যাস্তকালের অপেক্ষায় ছিলও সারাদিন। ভবনগুলোর কাঁচের গায়ে আকাশের হারিয়ে যাওয়া আলোরা এসে আসন পেতে বসে। আর সেই আলোয় বন্দর এলাকাকে আলোকিত করে তুলে। সিডনি হারবার ব্রিজ নির্মাণ শুরু হয় ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯ মার্চ ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে। ঐতিহাসিক এই ব্রিজটির উচ্চতা ৪৪০ ফুট। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ৩৭৬৬ ফুট। পোর্ট জ্যাকসনে স্টিলের তৈরী ব্রিজ। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম স্টিল-আর্ক ব্রিজের অন্যতম। ব্রিজটিতে রয়েছে চারটি রেলপথ, একটি মহাসড়ক এবং দুটি পায়ে হাটার পথ। আজকের ভ্রমণ তালিকায় অপেরা হাউজ এবং হারবার ব্রিজই ছিলও। আলো ঝলমলে রাতের সৌর্ন্দয্য দেখতে দেখতে কফি কাপের সঙ্গ নিই। প্রশান্ত মহাসাগরের হিমেল হাওয়া আর কফির তেতো স্বাদে অপেরা-হারবারের বর্ণিল রূপ সৌন্দর্য্য বিশাস শেষ হয়। ঐতিহ্য আর ঐতিহাসিক স্থাপনা ভ্রমন পর্বে সাথে ছিলেন স্বদেশি সহকর্মী শাহজাহান সেলিম ও ইদ্রিছ আলী। একটি সন্ধ্যা, একটি গোধূলী বেলায় প্রশান্ত পাড় থেকে প্রশান্তি নিয়েই ফিরছিলাম ট্রেনে চড়ে। ভ্রমনকারীরা সিডনি এলে ভ্রমন সূচীতে অপেরা হাউজ ও হারবার ব্রিজ রাখতে পারেন। সিডনির যেখানেই আপনার থাকার ব্যবস্থা থাকুক, আপনি বাস, ট্রেন অথবা প্রাইভেট কারে যেতে পারবেন। স্থান বেঁধে সময় যাতায়াত খরচ হবে। তবে, সময় নিয়ে গেলে সবচেয়ে কম খরচ পড়বে ট্রেনে। ট্রাভেল কার্ড নিয়ে নিলে খুবই অল্প খরচে ঘুরে আসতে পারবেন। সিডনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে আব্দুল আলিম শাহ | ১৭ জুলাই ২০২৩

ত্রয়ী প্রেমের নীল কাব্য; থ্রি সিস্টার্স

মেহনি (Meehni), উইমলা (Wimlah) ও গুনেডু (Gunnedoo) এরা তিন বোন। সৌর্ন্দয্য অতুলনীয় ছিলও তারা। তাদের নিয়ে নানা পৌরানিক গল্প আছে দ্বীপ মহাদেশ অস্ট্রেলিয়ার আদি ইতিহাসে। আদিমকালের এই ত্রয়ীর গল্প রহস্য ঘেরা। সুন্দরী রূপবতি এই ত্রয়ীর প্রতিবেশি ছিলও উপজাতি এক পরিবারে তিন সহোদর। তাদের নাম-দাম ইতিহাসে আজও অজানা। তবে, তাদের বসবাস ছিলও নীল পর্বতমালায় (Blue Mountains)। পৌরানিক গল্পের অজানা নায়করা আদিমতায় হারিয়ে গেলেও, সুন্দরী তিন বোনের এখনও দৃশ্যমান। নীল পর্বতে পাথর রূপে তারা এখনও অমলিন। শুধু বদলেছে গায়ের আবরণ। তারা এখন পাথুরে আকৃতি নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে আছেন! অস্ট্রেলিয়ার পৌরানিক গল্প অনুসারে, মেহনি, উইমলা ও গুনেডু- রূপবতি তিন বোন নীল পর্বতের বাসিন্দা উপজাতি তিন সহোদরের প্রেমে পড়েন। তাদের প্রেমের সর্ম্পক জানাজানি হয়। অসম প্রেম কাহিনী বলে খ্যাত হয় তাদের সে সর্ম্পক। তখনকার সময়ে উপজাতি সংস্কৃতির রীতিনীতিতে যা ছিলও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ৩ বোনের প্রেমের করুণ উপাখ্যান তৈরী হয়। মধুরতম প্রেমের বদলে সৃষ্টি হয় এক রক্তক্ষয়ি প্রেমকাহিনী। পর্বত জুড়ে বেদনার করুণ সুর উঠে। কি হয়েছিলও তখন? নীল পর্বতের বাসিন্দা মেহনিদের প্রেমে প্রাথমিক জয় হয়েছিল প্রতিবেশী উপজাতি গোত্রের তিন সহোদরের। কিন্তু প্রথা বিরোধী হওয়া  ভিন্ন গোত্রের মানুষের সাথে সর্ম্পক বাঁধার মুখে পড়ে। কিন্তু প্রেম কি বাঁধা মানে? মানে না। তাই তিন সহোদর মেহনিদের জোর পূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করেন। এই ঘটনায় দুই গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধে! সংঘর্ষ থামানোর কি উপায়? মেহনীদের গোত্রে এক যাদু বিদ্যান ছিলেন। জীবন রক্ষায় তিনি মেহনিদের জ্যামিসন উপত্যকার চুঁড়ায় নিয়ে যান এবং যাদু শক্তিতে মেহনিদের পাথরে রূপ দেন। তাতে তারা নিরাপদ হয়। সংঘাত থামলে তাদেরকে পূনরায় মানুষ রূপে ফিরিয়ে আনবেন এমন প্রত্যয় ছিলও। কিন্তু গোত্রদ্বয়ের মধ্যে তখনও সংঘাত চলছিলও। তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। সেই সংঘাতেই আহত হন  যাদুকর। তিনি মারা যান। মেহনিদের আর মানুষ রূপে ফিরি আসা হয়নি। সেই থেকে তারা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীল পর্বতের জেসমিন ভ্যালিতে। বেদনার নীলে ঘিরে যায় পুরো পর্বতমালা। চারপাশের পাহাড়গুলো নীলাকার হয়ে উঠে। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের আর কোথাও নীল পাহাড় নেই। অজিদের  বিশ্বাস- মেহনিদের বেদনার প্রতিক হয়ে পৃথিবীকে স্বাক্ষ্য দিচ্ছে নীল পর্বতের পাহাড়গুলো। নীল পর্বতের জেসমিন ভ্যালির চুঁড়ায় পাথুরে যে তিনটি ক্ষয় প্রাপ্ত পর্বত খন্ড দেখছেন এরাই অস্ট্রেলিয়ার পৌরানিক গল্পের তিন বোন! যা এখন থ্রি সিস্টার্স নামে পরিচিত। এটি বর্তমানে সিডনির বিখ্যাত একটি পর্যটন কেন্দ্র। আদিম থেকে আধুনিকতায় মেহনিরা উজ্জ্বল হয়ে উঠেন। নিজেদের সৌন্দর্য্য বিলিয়ে ভালোবাসা দিয়ে যাচ্ছেন পাথুরে ত্রয়ী। তিন বোনের প্রেমের শেষ পরিনতি হয়ে থাকলো থ্রি সিস্টার্স। তাদের প্রেমের করুন সুর এখনও বিশ্ব হৃদয় কাঁদায়। বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে ভ্রমনকারী সিডনি আসলে থ্রি সিস্টার্স দেখতে ভুল করেন না। মুগদ্ধ হন পাথর হয়ে যাওয়া মেহনিদের সৌর্ন্দয্যে। আমিও দেখে সেই বেদনার নীল, নীলা পর্বত চুঁড়া। থ্রি সিস্টার্স-এর প্রাকৃতিক গঠণ থ্রি সিস্টার্স-এর অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের কাটুম্বা শহরবর্তি নীল পর্বতমালার জেমিসন ভ্যালিতে। প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ‘ট্রায়াসিক’ আমলে ভূমি ক্ষয় হয়ে গড়ে উঠে ‘থ্রি সিস্টার্স’ (Three Sisters)। নীল পর্বতমালার বেলেপাথর প্রচন্ড বাতাস, ভারি বৃষ্টি আর পর্বতমালার খরস্রোতা নদীর তুড়ে ক্ষয় হতে শুরু করে। সেসময় জেমিসন উপত্যকার চারপাশের পর্বতগুলোতে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দেয়। এক পর্যায়ে পর্বতমালার অংশ বিশেষ সমুদ্র জলে তলিয়ে যায়। প্রাকৃতিক সেই গঠন-পূর্ণগঠনে মহাসাগরের তলে একটি পলল স্থর গড়ে উঠে। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট উপাদান সমূহ ভূমিক্ষয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে বেলেপাথরে রূপ নেয়। এক সময় সেই বেলেপাথরের স্থরে শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়। এর ফলে পর্বতমালায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়। থ্রি সিস্টার্স সেই পারিবর্তনেরই এক রূপ। থ্রি সিস্টার্স এর উচ্চতা অনুযায়ি তিন বোনের নামে নামায়ন করা হয়। ৩০২৫ ফুট উচ্চতার পাথরটির নাম মেহনি (Meehni)। উইমলা’র (Wimlah) উচ্চতা ৩০১২। ফুট আর গুনেডু’র (Gunnedoo) উচ্চতা ২৯২৮ ফুট। রুক্ষ পর্বতমালার আর্শ্চয্য এই প্রাকৃতিক দৃশ্যে দেখতে প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রনম পিপাসুরা আসেন। ৩৯০০ ফুট উচ্চতার নীল পর্বতের পিক পয়েন্ট থেকে এর সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। এখানে আসলে রুক্ষ খাড়া পর্বত চুড়ায় মেঘের দৌড়ানি দেখে যেকেউ মুগদ্ধ হবেন। পর্বতমালার দূর সীমানায় সূর্য্যালোকের পরিবর্তনের ফলে রূপ বদলায় ক্ষনে ক্ষনে। একইভাবে থ্রি সিস্টার্সে রূপ রং বদলায়। একেক আলোয় একেক রূপে ধরণ করে। তবে, মেঘলা আবহাওয়ায় এখানকার পরিবর্তন  ভ্রমনার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয়। এছাড়া, খাড়া রুক্ষ পাহাড়, ইউক্যালিপটাস বন, জলপ্রপাত, পাহাড়ী গ্রাম দেখার অভিজ্ঞতা নিতেই পারেন যেকোউ। সেক্ষেত্রে অবশ্য নীল পর্বতের অন্তত একরাত থাকার প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে। সিডনি থেকে নীল পর্বত যাবেন কিভাবে? রেল, বাস ও প্রাইভেট কারে যেতে পারেন সিডনি শহর থেকে ১১২.৬ কিলোমিটার দূরত্বের পর্যটন কেন্দ্রে। ট্রেনে দেড়’শ অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরছে ট্রেনে যেতে সময় লাগবে আড়াই থেকে ৩ ঘন্টা। একই পরিমান সময়ে বাসে যেতে খরচ হবে একশ ত্রিশ থেকে একশ চল্লিশ ডলার। তবে সময় বাঁচাতে চাইলে প্রাইভেট কার ভাড়া করে দেড় ঘন্টায় পৌছাতে পারেন। আব্দুল আলিম শাহ | সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

স্মৃতি চড়ে- মাটি পথের নির্জনে

সন্ধ্যা নামলেই নির্জনতা ঘিরে রাখতো। গ্রামীণ আঁধার কাটতো কুপি বাতির আলোয়। দুই এক বাড়িতে অবশ্য হারিকেন পৌঁছেছে। গাওয়ের হাট বসতো সপ্তাহে তিন দিন। সোম, বুধ ও শুক্রবার। হাটবার ছিলও বড়দের কাছে প্রয়োজন আর ছানাপোনাদের কাছে বিনোদনের। পিয়াজু, মুড়িমুড়কি খেতে খেলাধুলা কমিয়ে সবার গন্তব্য হাটবার মিস হতো না। বয়স তখন সাত কি আট। বার কি ছিলও ঠিক মনে নেই। টিলা পথে হাট করে ফিরছিলাম। সন্ধ্যার আঁধারে আলো হারাচ্ছিল। আগে পিছে গাল গপ্পে বাড়ি ফিরছিলও অনেকে। পথের ধারে বাশ ঝাড়ে ঝিঝিদের কানফাটা শব্দের দখলে ছিল প্রকৃতি। কারো কথা ঠাওর করার মতো ছিলও না। তবে মানুষে মানুষে কথা বলার একটা রব এখনও কানে বাজে। টিলার ঢালে মাটি পথের পাশে বনো সবুজ আলোকিত করছিলও মিটিমিটি জোনাকির ঝাক। সেদিনের জোনাকির আলো আঁধার কাটিয়ে পথ যেন আলোয় চকচক করছিলও। ঠিক যেমন মহাশূন্য আলোকিত করে তারারা। জোনাকির ছোট্ট আলো ঝলক আজও চোখে ভাসে। সেদিন বড় কষ্টে একটি জোনাক ধরে ছিলাম। মিটিমিটি আলো তারা হাতে সেকি আনন্দ। এখনও অনুভবে সুখ পাই। আলো হাতে ফিরতে ফিরতে অনেকটা পথ পার হয়। দু’হাতের মুঠোয় যত্নে বাড়ি ফিরি। খুশিতে গদগদ। মুঠো খুলিনি জোনাক হারানো ভয়ে। কাছে থেকে দেখার স্বাধও নিতে পারছিনা। দশ, বিশ গুনে মুঠো খুলে দেখি কিছুই নেই। কখন যেন সে উড়ে যায়, বুঝিনি। আলো হারানো সেদিনের কষ্টকে বড়রা ছেলেমানুষী বলে তুচ্ছ করেছিলেন। কিন্তু মাঝ বয়সে এসেও নিজের কাছে সেই স্মৃতি অমূল্য। ছোটতার, ছেলেমানুষীর সেদিনে এখনও ফিরতে চাই। কিন্তু সে সুযোগ কই, স্মৃতি ছাড়া। এখন কেবলই অন্য এক ফেরার তাগাদায়। রাতের কালো, রঙের আলোয় চকচক এখন। গ্রামীণ মাটি পথ এখন বিটুমিনে মসৃণ। গতিতে বিশ্ব বাজারের নামি দামি গাড়ি চলে। টিলার ঢালের বাশ ঝাড় নেই। উজাড়, নির্বংশ প্রায়। ঝিঝিরা শব্দ হারিয়ে বোবা হয়ে গেছে। প্রকৃতির সাথে পাল্টেছে গ্রাম সভ্যতা, রীতিনীতি। এখন নির্দিষ্ট দিনে হাট বসে না। পুরো গ্রামই যেন হাট। সবখানে দোকান। সবদিনই হাট বার, বাজার। জোনাকিদের বিচরণ ক্ষেত এখন বিদ্যুৎ খুটির দখলে। তারারা মহাকাশে এখনও আলো দিলেও জোনাকিরা চলে গেছে ভিন দেশে, আঁধার কালো নির্জন কোনো গ্রামে। তোমরা ফিরে আসো। না হয় আমাকেই যেতে হবে, স্মৃতি চড়ে। ৭ জুলাই ২০২৩

সিলেটে জঙ্গিরা নিরাপদ মনে করে কেন? কারা টার্গেট?

সিলেটে বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয়কে হত্যা করেছিলও। সিলেটে অধ্যাপক ড. মু. জাফর ইকবাল স্যারকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করেছিলও। সিলেটে আতিয়া মহলে শতাধিক সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে হত্যা চেষ্টা করেছিলও জঙ্গি মুসা সহ তার সহযোগিরা। সিলেটে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জগৎজ্যোতিকে হত্যা করে ছিলও মৌলবাদি জঙ্গি গোষ্ঠি। সিলেট থেকে স্বপরিবারে আইএসে যোগ দিতে গিয়েছিল নব্য জঙ্গিরা। সিলেট জঙ্গি মাস্টার মাইন্ড শায়েখ আব্দুর রহমান নিরাপদ মনে করে দীর্ঘ দিন আত্ম গোপনে থেকে নাশকতার পরিকল্পনা করছিলও। সিলেট মসজিদে নামাজ শেষে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে হামলা করে ভাঙ্গচুর, অগ্নি সংযোগ করে ছিলও মৌলবাদিরা। সিলেট জুম’আর নামাজ শেষে ঝটিকা সভা করতো নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত রাহরির, চৌকুস সেনা অফিসারদের আহবান করতো খেলাফত প্রতিষ্ঠায় অংশ নিতে। সিলেট হেফাজতের তান্ডবের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকআপ। সিলেট থেকে একসময় দলে দলে উসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে যুদ্ধ করতে আফগান যেতো জিহাদিরা। স্বগৌরবে প্রচার করা হতো আফগানের অভিজ্ঞতা।  সেই অবস্থার কতোটা পরিবর্তন হয়েছে? কেন সিলেট মৌলবাদি জঙ্গি গোষ্ঠির পছন্দের তালিকায়। কেন তারা এখানেই নিরাপদ মনে করে? এ প্রশ্ন সামনে আসে ঘটনার ধারায়। কদিন কথা বার্তা, আলোচনা হয়। আইনশৃংখলাবাহীনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার তথ্য প্রচার করেন। ফলোআপ গোচরে আসে না। বারবারই চাপা পড়ে যায় মূল, অনুসন্ধানে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা দেখা যায় না। বিষয়টি ভাবনার। আমাদের চারপাশ থেকে ওরা বেড়ে ওঠে। সমাজিকভাবে জঙ্গিবাদের জড়িয়ে পড়া রোধে কোন উদ্দ্যোগ আসে না। উল্টো পারিবারিক মদদে লালিত হয় নব্য জঙ্গিরা। আইনশৃংখলাবাহীনির হাতে ধরা পড়ার পর পরিবারের কাছে জানা যায় ‘সে’ তো অনেকদিন থেকে এক একা থাকতে পছন্দ করতো। ঘরে দরজা জানালা বন্ধ করে লেখাপড়া করতো। পাড়া-মহল্লার কারো সাথে মিশতো না। আত্মিয় স্বজনের বাড়িতে যেতো না। এমন অসংখ্যা লক্ষণ তারা দেখেন বলে যখন স্বীকার করেন, তখন তাদের সন্তানটি আর আয়ত্বে নেই। ততো দিনে ‘সে’ পরিনত হয়েছে একজন প্রশিক্ষিত জঙ্গিতে। পরিবার কখনও খেয়াল করেনি তাদের সন্তান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাদের সাথে চলাফেরা করে। একাডেমিক কাজের বাইরে তার বিচরণ কোথায় কোথায় তা নিয়ে কখনওই ভাবেননি। কখনও ‘তার’ ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ফলো করেননি বিপথে যাওয়ার পর স্বীকার করেন ‘সে’ কখনও তার মোবাইল, ল্যাপটপ আন লক রাখতো না। প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো পরিবার পরিজন এসব খোঁজ রাখার প্রয়োজন মনে করেনি? অভিবাবক হিসেবে আপনার দায়িত্বে মধ্যে এসব পড়ে না, কেন মনে করেন? আপনার সন্তান জঙ্গি হয়ে উঠলে- আপনার নিজের ক্ষতি, সমাজ ধ্বংসের কারণ শুধু নয়, দুনিয়ার জন্য ‘সে’ ভয়ংকর কিছু। শান্তির পরিবার, সমাজ, দেশ, বিশ্বকে অশান্ত করে তুলতে যথেষ্ট হয়।  ফলে আমাদের চোখ কান খোলা রেখে অভিবাবকত্বকে ঢেলে সাজানোর কোন বিকল্প দেখছিনা। কারণ সর্বোতভাবে একটি সন্তান জঙ্গি হয়ে ওঠার পেছনে অভিবাবক, পারিবার পরিজনের প্রশ্রয় প্রাথমিকভাবে দায়ি। পাড়া প্রতিবেশিরাও দায়ি- তারা একটি সন্তানের অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা দেখেও কখনও কিছু বলে না। কে কিভাবে নিবে তার সন্তানের চলাচল নিয়ে কথা বললে সেই ভয়ে পাড়া প্রতিবেশিরা নিরব থাকেন।  জঙ্গিবাদের মতো ব্যাধি রোধে সামাজিক বন্ধন আরো শক্ত করতে হবে। দমবন্ধ প্রতিবেশিপনায় এমন অপরাধিরা আপনার আমার চোখের সামনেই বেড়ে উঠবে।  আরেকি বিষয় বড় অবহেলায় ঘটছে। সিলেটে এসেই নিরাপদে জঙ্গিরা আস্তানা করতে পারছে। আপনি খুব সহজেই সামান্য লাভের আসায় যে কাউকে বাসা বাড়ি ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি! আইনের তোয়াক্কা না করে ভাড়াটিয়ার সাথে চুক্তি করছি না। নিকস্থ থানায় জানাচ্ছিনা নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য। বাসা বাড়ি ভাড়া প্রদানের আগে কাদের ভাড়া দিচ্ছেন সেতথ্য যেমন নিজে জানছেন না, আইনশৃংখলাবাহীনিকেও জানাচ্ছেন না। এতে সাময়িক আপনি লাভের মুখ দেখলেও দীর্ঘ মেয়াদে নিজে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। সমাজকে, দেশকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।  ৯ মে ২০২৩ তারিখে সিলেটে বড় ধরণের নাশকতা পরিকল্পনা করা নব্য জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র দাওয়াতি শাখার প্রধান আব্দুল্লাহ মায়মূন সহ, সালাউদ্দিন রাজ্জাক মোল্লা, মোহাম্মদ আবু জাফর তাহান ও আক্তার কাজী সাইদ আইজল আইনশৃংখলাবাহীর হাতে ধরা পড়ে। এরা সপ্তাহখানেক আগে সিলেট আসে এবং ভুয়া পরিচয়ে বড়শলা এলাকায় বাসা ভাড়া নেয়। গত সোমবার রাতে সেই বাসায় অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সংগঠনের চার সদস্যকে আটক করে র‍্যাব। আইনশৃংখলাবাহীনির তথ্য, পার্বত্য অঞ্চলে কুকিজ ন্যাশনাল ফ্রন্টের মাধ্যমে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেয় এই ৪ জঙ্গি। আনসার আল ইসলামের সাথে যোগাযোগ স্থাপন, অর্থ সংস্থান ও সংগঠনের কার্যক্রম বেগবান করছিলও তার। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’ এর সহায়তায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয় তারা।  এই জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাসহ মোট ৬৮ জন এবং পাহাড়ে অবস্থান, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কার্যক্রমে জঙ্গিদের সহায়তার জন্য ‘কেএনএফ’ এর ১৭ জন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের দেশে কতোটা আশাবাদি হওয়ার খবর এটি সেই প্রশ্ন সামনে আসে। প্রশ্ন আসে সিলেটেই কেন প্রশিক্ষিত জঙ্গিরা আস্তানা করছে বারবার। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদি বিষবাস্প ছড়ানোর জন্য কেন সিলেটই তাদের পছন্দ, সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। তবে সমাজ সচেতনতাই কেবল হতে পারে এসব উগ্রতার রুখতে। একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে সর্বস্থরের মানুষের সচেতনতাই ভরসা। আর কারা তাদের টার্গেট সেই প্রশ্নর উত্তর সবার জানা। ধর্মান্ধতা বিরোধী, মৌলবাদ বিরোধী আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা মনস্করাই তাদের মাথা ব্যথা।  আব্দুল আলিম শাহ, সাংবাদিক, সিলেট। 

যাদের চোখ অন্ধ এবং বুক থাকে বন্ধ

সেদিন সাদা মেঘে ঢাকা ছিলো নীলাকাশ। ঠিক তাদের মতো। যাদের চোখ অন্ধ এবং বুক বন্ধ থাকে। কেমন তারা? তারা নিজেরা বিশ্বাসী। নিজ মতের বিশ্বাসীদের দলবদ্ধ করতে সক্রিয় থাকে। প্রগতিশীলতার নামে ভিন্ন বিশ্বাসে তিরস্কার ছড়ায়। তারা কখনও কখনও পুকুর চুরি, সীমান্ত চুরি, ভূমি চুরির সেল্টার দাতা। এরা কিন্তু মেঘে ঢাকা সাদা আকাশের মতো ফকফকা সমাজে, অনুকরণীয়। বরণীয়। তাদের মুখোশ চেনে সবাই, কিছুই বলে না। মজা লয়।

স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে টিটকারি দেয় কারা?

একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, মহান স্বাধীনতা নিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলবো! তুচ্ছ তাচ্ছিল্যও করবো! কিন্তু কিচ্ছু করতে পারবেন না। এই না হইলো স্বাধীনতা। ১০ টাকার চালও খাবো, ১০ টাকা দিয়ে স্বাধীনতা কিনবো-বেচবো। কিচ্ছু কইতে পারবেন না কেউ। রাজাকাররা এসব করতো। তাদের উত্তরসূরীরা এখনও করে, সে যে রাজনৈতিক দলেই আবাসিক হউক না কেন। স্বাধীনতা নিয়ে টিটকারি মারা শেখানো আর যাই হউক, মগজে পচঁন ধরার লক্ষন ছাড়া কিছুই না।

চুরি-ডাকাতির ইতিহাসে প্রধান্য পাবে ভূমি ডাকাতি

হাতালির নাম ডাকাতি, বাঘা হাওরের ভূমি চুরি শত বছর পরেও ইতিহাসে অনন্য নজির হয়ে থাকবে। কেন? গত শতকের চুরি-ডাকাতির ইতিহাসে প্রধান্য পাবে ভূমি ডাকাতি। মোস্তাক আহমাদ দীন সম্পাদিত ও বাঙ্গালা পুলিশের ডেপুটি ইনস্পেকটর-জেনেরাল, এ, সি, ডালি, সি, আই, ই, প্রণীত “বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্ব্বৃত্ত জাতি চুরি ডাকাইতি প্রভৃতি করে তাহাদের সম্বন্ধে পুস্তক”-পড়ে চুরি-ডাকাতির শতবছর পূর্বের ইতিহাস জানা গেল। এ বইয়ে আলোচ্য “ছাপ্পড় বাঁধ” এক দূর্বিত্ত সম্প্রদায়। যারা প্রধানত চুরি-ডাকাতি করতো এবং নকল মুদ্রা তৈরী করে প্রতারণা করতো। এমন অনেকগুলো শ্রেনী নিয়ে অপরাধের ধরণ বিষয়ক বই এটি। আলোচ্য বিষয়- ছাপ্পড় বাঁধ বা অন্য কোন শ্রেনী নয়। গত শতকে বাংলায় আরো কতো, কতো ধরনের প্রতারণা, চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে তার কি হিসেবে জানছি আমরা। কতো কতো শ্রেনীর মানুষ সেসব চুরি-ডাকাতি ও প্রতারণার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন? তাদের ইতিহাস জানার বেশ দেরি হয়ে গেছে এরই মধ্যে। আমার বিশ্বাস এই কনটেন্টের উপর কাজ করলে ‘ভূমি চুরি-ডাকাতি’ প্রাধান্য পাবে। পাওয়া যাবে চোর-ডাকাতদের পরিচয়। তবে, একটি চুরি কিংবা ডাকাতি ঘটনার জের দিয়ে এক শ্রেনী/সম্প্রদায়কে ডকুমেন্টেড চুরি-ডাকাতির ট্যাগ দিয়ে দেওয়া প্রশ্নের মুখে পড়বে কি না, সেটা জানা দরকার।